Ticker

6/recent/ticker-posts

CLASS 10 | নানা বিদ্যার আয়োজন | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর || প্রশ্ন উত্তর | সাহিত্য সম্ভার | দশম শ্রেণী | দ্বিতীয় ভাষা || পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ WBBSE



তখন নর্মাল স্কুলের একটি শিক্ষক, শ্রীযুক্ত নীলকমল ঘোষাল মহাশয় বাড়িতে আমাদের পড়াইতেন। তাঁহার শরীর ক্ষীণ শুষ্ক ও কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ম ছিল। তাঁহাকে মানুষজন্মধারী একটি ছিপ্‌ছিপে বেতের মতো বোধ হইত। সকাল ছটা হইতে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাভার তাঁহার উপর ছিল। চারুপাঠ(1), বস্তুবিচার(1), প্রাণিবৃত্তান্ত(2) হইতে আরম্ভ করিয়া মাইকেলের মেঘনাদবধকাব্য পর্যন্ত ইঁহার কাছে পড়া। আমাদিগকে বিচিত্র বিষয়ে শিক্ষা দিবার জন্য সেজদাদার(3) বিশেষ উৎসাহ ছিল। ইস্কুলে আমাদের যাহা পাঠ্য ছিল বাড়িতে তাহার চেয়ে অনেক বেশি পড়িতে হইত। ভোর অন্ধকার থাকিতে উঠিয়া লংটি পরিয়া প্রথমেই এক কানা পালোয়ানের(4) সঙ্গে কুস্তি করিতে হইত। তাহার পরে সেই মাটিমাখা শরীরের উপরে জামা পরিয়া পদার্থবিদ্যা(1), মেঘনাদবধকাব্য, জ্যামিতি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল শিখিতে হইত। স্কুল হইতে ফিরিয়া আসিলেই ড্রয়িং এবং জিম্‌নাস্টিকের মাস্টার আমাদিগকে লইয়া পড়িতেন। সন্ধ্যার সময় ইংরেজি পড়াইবার জন্য আঘোরবাবু আসিতেন। এইরূপে রাত্রি নটার পর ছুটি পাইতাম।

রবিবার সকালে বিষ্ণুর(5) কাছে গান শিখিতে হইত। তা ছাড়া প্রায় মাঝে মাঝে সীতানাথ দত্ত(6) মহাশয় আসিয়া যন্ত্রতন্ত্রযোগে প্রাকৃতবিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। এই শিক্ষাটি আমার কাছে বিশেষ ঔৎসুক্যজনক ছিল। জ্বাল দিবার সময় তাপসংযোগে পাত্রের নীচের জল পাতলা হইয়া উপরে উঠে, উপরের ভারী জল নীচে নামিতে থাকে, এবং এইজন্যই জল টগবগ করে— ইহাই যেদিন তিনি কাচপাত্রে জলে কাঠের গুঁড়া দিয়া আগুনে চড়াইয়া প্রত্যক্ষ দেখাইয়া দিলেন সেদিন মনের মধ্যে যে কিরূপ বিস্ময় অনুভব করিয়াছিলাম তাহা আজও স্পষ্ট মনে আছে। দুধের মধ্যে জল জিনিসটা যে একটা স্বতন্ত্র বস্তু, জ্বাল দিলে সেটা বাষ্প আকারে মুক্তিলাভ করে বলিয়াই দুধ গাঢ় হয়, এ কথাটাও যেদিন স্পষ্ট বুঝিলাম সেদিনও ভারি আনন্দ হইয়াছিল। যে-রবিবারে সকালে তিনি না আসিতেন, সে-রবিবার আমার কাছে রবিবার বলিয়াই মনে হইত না।

ইহা ছাড়া, ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলের একটি ছাত্রের কাছে কোনো-এক সময়ে অস্থিবিদ্যা শিখিতে আরম্ভ করিলাম। তার দিয়া জোড়া একটি নরকঙ্কাল(7) কিনিয়া আনিয়া আমাদের ইস্কুলঘরে লটকাইয়া দেওয়া হইল।

ইহারই মাঝে এক সময়ে হেরম্ব তত্ত্বরত্ন মহাশয় আমাদিগকে একেবারে ‘মুকুন্দং সচ্চিদানন্দং’ হইতে আরম্ভ করিয়া মুগ্ধবোধের সূত্র মুখস্থ করাইতে শুরু করিয়া দিলেন। অস্থিবিদ্যার হাড়ের নামগুলা এবং বোপদেবের সূত্র, দুয়ের মধ্যে জিত কাহার ছিল তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারি না। আমার বোধ হয় হাড়গুলিই কিছু নরম ছিল।

বাংলাশিক্ষা যখন বহুদূর অগ্রসর হইয়াছে তখন আমরা ইংরেজি শিখিতে আরম্ভ করিয়াছি। আমাদের মাস্টার অঘোরবাবু মেডিকেল কলেজে পড়িতেন। সন্ধ্যার সময় তিনি আমাদিগকে পড়াইতে আসিতেন। কাঠ হইতে অগ্নি উদ্‌ভাবনটাই মানুষের পক্ষে সকলের চেয়ে বড়ো উদ্‌ভাবন, এই কথাটা শাস্ত্রে পড়িতে পাই। আমি তাহার প্রতিবাদ করিতে চাই না। কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় পাখিরা আলো জ্বালিতে পারে না, এটা যে পাখির বাচ্ছাদের পরম সৌভাগ্য এ কথা আমি মনে না করিয়া থাকিতে পারি না। তাহারা যে ভাষা শেখে সেটা প্রাতঃকালেই শেখে এবং মনের আনন্দেই শেখে, সেটা লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন। অবশ্য, সেটা ইংরেজি ভাষা নয়, এ কথাও স্মরণ করা উচিত।

এই মেডিকেল কলেজের ছাত্রমহাশয়ের স্বাস্থ্য এমন অত্যন্ত অন্যায়রূপে ভালে ছিল যে, তাঁহার তিন ছাত্রের একান্ত মনের কামনাসত্ত্বেও একদিনও তাঁহাকে কামাই করিতে হয় নাই। কেবল একবার যখন মেডিকেল কলেজের ফিরিঙ্গি ছাত্রদের সঙ্গে বাঙালি ছাত্রদের লড়াই হইয়াছিল, সেইসময় শত্রুদল চৌকি ছুঁড়িয়া তাঁহার মাথা ভাঙিয়াছিল। ঘটনাটি শোচনীয় কিন্তু সে-সময়টাতে মাস্টারমহাশয়ের ভাঙা কপালকে আমাদেরই কপালের দোষ বলিয়া গণ্য করিতে পারি নাই, এবং তাঁহার আরোগ্যলাভকে অনাবশ্যক দ্রুত বলিয়া বোধ হইয়াছিল।

সন্ধ্যা হইয়াছে; মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছে; রাস্তায় একহাঁটু জল দাঁড়াইয়াছে। আমাদের পুকুর ভরতি হইয়া গিয়াছে; বাগানের বেলগাছের ঝাঁকড়া মাথাগুলা জলের উপরে জাগিয়া আছে; বর্ষাসন্ধ্যার পুলকে মনের ভিতরটা কদম্বফুলের মতো রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিয়াছে। মাস্টারমহাশয়ের আসিবার সময় দু-চার মিনিট অতিক্রম করিয়াছে। তবু এখনো বলা যায় না। রাস্তার সম্মুখের বারান্দাটাতে চৌকি লইয়া গলির মোড়ের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাইয়া আছি। ‘পততি পতত্রে বিচলতি পত্রে শঙ্কিত ভবদুপযানং’ যাকে বলে। এমন সময় বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা যেন হঠাৎ আছাড় খাইয়া হা হতোস্মি করিয়া পড়িয়া গেল। দৈবদুর্যোগে-অপরাহত সেই কালো ছাতাটি দেখা দিয়াছে। হইতে পারে আর কেহ। না, হইতেই পারে না। ভবভূতির সমানধর্মা বিপুল পৃথিবীতে মিলিতেও পারে কিন্তু সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমাদেরই গলিতে মাস্টারমহাশয়ের সমানধর্মা দ্বিতীয় আর কাহারও অভ্যুদয় একেবারেই অসম্ভব।(8)

যখন সকল কথা স্মরণ করি তখন দেখিতে পাই, অঘোরবাবু নিতান্তই যে কঠোর মাস্টারমশাই-জাতের মানুষ ছিলেন, তাহা নহে। তিনি ভুজবলে আমাদের শাসন করিতেন না। মুখেও যেটুকু তর্জন করিতেন, তাহার মধ্যে গর্জনের ভাগ বিশেষ কিছু ছিল না বলিলেই হয়। কিন্তু তিনি যত ভালোমানুষই হউন, তাঁহার পড়াইবার সময় ছিল সন্ধ্যাবেলা এবং পড়াইবার বিষয় ছিল ইংরেজি। সমস্ত দুঃখদিনের পর সন্ধ্যাবেলায় টিম্‌টিমে বাতি জ্বালাইয়া বাঙালি ছেলেকে ইংরেজি পড়াইবার ভার যদি স্বয়ং বিষ্ণুদূতের উপরেও দেওয়া যায়, তবু তাহাকে যমদূত বলিয়া মনে হইবেই, তাহাতে সন্দেহ নাই। বেশ মনে আছে, ইংরেজি ভাষাটা যে নীরস নহে আমাদের কাছে তাহাই প্রমাণ করিতে অঘোরবাবু একদিন চেষ্টা করিয়াছিলেন; তাহার সরসতার উদাহরণ দিবার জন্য, পদ্য কি গদ্য তাহা বলিতে পারি না, খানিকটা ইংরেজি তিনি মুগ্ধভাবে আমাদের কাছে আবৃত্তি করিয়াছিলেন। আমাদের কাছে সে ভারি অদ্ভুত বোধ হইয়াছিল। আমরা এতই হাসিতে লাগিলাম যে সেদিন তাঁহাকে ভঙ্গ দিতে হইল; বুঝিতে পারিলেন, মকদ্দমাটি নিতান্ত সহজ নহে— ডিক্রি পাইতে হইলে আরো এমন বছর দশ-পনেরো রীতিমতো লড়ালড়ি করিতে হইবে।

মাস্টারমশায় মাঝে মাঝে আমাদের পাঠমরুস্থলীর মধ্যে ছাপানো বহির বাহিরের দক্ষিণহাওয়া আনিবার চেষ্টা করিতেন। একদিন হঠাৎ পকেট হইতে কাগজে-মোড়া একটি রহস্য বাহির করিয়া বলিলেন, “আজ আমি তোমাদিগকে বিধাতার একটি আশ্চর্য সৃষ্টি দেখাইব।” এই বলিয়া মোড়কটি খুলিয়া মানুষের একটি কণ্ঠনালী বাহির করিয়া তাহার সমস্ত কৌশল ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। আমার বেশ মনে আছে, ইহাতে আমার মনটাতে কেমন একটা ধাক্কা লাগিল। আমি জানিতাম, সমস্ত মানুষটাই কথা কয়; কথা-কওয়া ব্যাপারটাকে এমনতরো টুকরা করিয়া দেখা যায়, ইহা কখনো মনেও হয় নাই। কলকৌশল যতবড়ো আশ্চর্য হউক-না কেন, তাহা তো মোট মানুষের চেয়ে বড়ো নহে। তখন অবশ্য এমন করিয়া ভাবি নাই কিন্তু মনটা কেমন একটু ম্লান হইল; মাস্টারমশায়ের উৎসাহের সঙ্গে ভিতর হইতে যোগ দিতে পারিলাম না। কথা কওয়ার আসল রহস্যটুকু যে সেই মানুষটির মধ্যেই আছে, এই কণ্ঠনালীর মধ্যে নাই, দেহব্যবচ্ছেদের কালে মাস্টারমশায় বোধ হয় তাহা খানিকটা ভুলিয়াছিলেন, এইজন্যই তাঁহার কণ্ঠনালীর ব্যাখ্যা সেদিন বালকের মনে ঠিকমতো বাজে নাই। তার পরে একদিন তিনি আমাদিগকে মেডিকেল কলেজের শবব্যবচ্ছেদের ঘরে লইয়া গিয়াছিলেন। টেবিলের উপর একটি বৃদ্ধার মৃতদেহ শয়ান ছিল; সেটা দেখিয়া আমার মন তেমন চঞ্চল হয় নাই; কিন্তু মেজের উপরে একখণ্ড কাটা পা পড়িয়াছিল, সে-দৃশ্যে আমার সমস্ত মন একেবারে চমকিয়া উঠিয়াছিল। মানুষকে এইরূপ টুকরা করিয়া দেখা এমন ভয়ংকর, এমন অসংগত যে সেই মেজের উপর পড়িয়া-থাকা একটা কৃষ্ণবর্ণ অর্থহীন পায়ের কথা আমি অনেক দিন পর্যন্ত ভুলিতে পারি নাই।

প্যারি সরকারের প্রথম দ্বিতীয় ইংরেজি পাঠ(9) কোনোমতে শেষ করিতেই আমাদিগকে মকলক্‌স্‌ (10) কোর্স অফ রীডিং শ্রেণীর একখানা পুস্তক ধরানো হইল। একে সন্ধ্যাবেলায় শরীর ক্লান্ত এবং মন অন্তঃপুরের দিকে, তাহার পরে সেই বইখানার মলাট কালো এবং মোটা, তাহার ভাষা শক্ত এবং তাহার বিষয়গুলির মধ্যে নিশ্চয়ই দয়ামায়া কিছুই ছিল না, কেননা শিশুদের প্রতি সেকালে মাতা সরস্বতীর মাতৃভাবের কোনো লক্ষণ দেখি নাই। এখনকার মতো ছেলেদের বইয়ে তখন পাতায় পাতায় ছবির চলন ছিল না। প্রত্যেক পাঠ্যবিষয়ের দেউড়িতেই থাকে-থাকে-সারবাঁধা সিলেবল্‌-ফাঁক-করা বানানগুলো অ্যাক্‌সেন্ট-চিহ্নের তীক্ষ্ম সঙিন উঁচাইয়া শিশুপালবধের জন্য কাওয়াজ করিতে থাকিত। ইংরেজি ভাষার এই পাষাণদুর্গে মাথা ঠুকিয়া আমরা কিছুতেই কিছু করিয়া উঠিতে পারিতাম না। মাস্টারমহাশয় তাঁহার অপর একটি কোন্‌ সুবোধ ছাত্রের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করিয়া আমাদের প্রত্যহ ধিক্‌কার দিতেন। এরূপ তুলনামূলক সমালোচনায় সেই ছেলেটির প্রতি আমাদের প্রীতিসঞ্চার হইত না, লজ্জাও পাইতাম অথচ সেই কালো বইটার অন্ধকার অটল থাকিত। প্রকৃতিদেবী জীবের প্রতি দয়া করিয়া দুর্বোধ পদার্থমাত্রের মধ্যে নিদ্রাকর্ষণের মোহমন্ত্রটি পড়িয়া রাখিয়াছেন। আমরা যেমনি পড়া শুরু করিতাম অমনি মাথা ঢুলিয়া পড়িত। চোখে জলসেক করিয়া, বারান্দায় দৌড় করাইয়া, কোনো স্থায়ী ফল হইত না। এমন সময় বড়দাদা(11) যদি দৈবাৎ স্কুলঘরের বারান্দা দিয়া যাইবার কালে আমাদের নিদ্রাকাতর অবস্থা দেখিতে পাইতেন তবে তখনই ছুটি দিয়া দিতেন। ইহার পরে ঘুম ভাঙিতে আর মুহূর্তকাল বিলম্ব হইত না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) : জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ভারতী ও বালক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। কথা ও কাহিনী, সহজপাঠ, রাজর্ষি, ছেলেবেলা, শিশু, শিশু ভোলানাথ, হাস্যকৌতুক, ডাকঘর; গল্পগুচ্ছসহ তাঁর বহু রচনাই শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করে। দীর্ঘ জীবনে অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। এশিয়ার মধ্যে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে Song Offerings-এর জন্যে। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা ।



** তথ্যসূত্র **

1. অক্ষয়কুমার দত্ত রচিত। বস্তুবিচার—? ‘বাহ্য বস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির বিচার’।
2. সাতকড়ি দত্ত রচিত।
3. হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৪-৮৪), দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র
4. “হীরা সিং নামক শিখ পালোয়ান।” –প্রবাসী, মাঘ ১৩১৮, পৃ ৩৮৮
5. বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী(১৮১৯-? ১৯০১)
6. (?) সীতানাথ ঘোষ (১২৪৮-৯০), দ্র প্রবাসী, মাঘ ১৩১৮, পৃ ৩৮৮, জৈষ্ঠ্য ১৩১৯, পৃ ২১৩
7.  তথ্যসূত্র (information): ‘কঙ্কাল’, গল্পগুচ্ছ ১, রবীন্দ্র-রচনাবলী ১৬ (সুলভ ৮)
8. তথ্যসূত্র (information): ‘অসম্ভব কথা’, গল্পগুচ্ছ ১
9. Peary Churn Sircar: First Book or Reading, Second Book or Reading.
11. দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪০-১৯২৬), দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র...

★ টীকা (note): 

> কাওয়াজ, [ বিশেষ্য / noun ] : 1. কৌশল, কসরত; 2. সৈন্যদের যুদ্ধকৌশল শিক্ষা বা ড্রিল। [আরবি. কবায়দ্]। training in the use of guns; parade.
> সঙিন, [ বিশেষ্য / noun ] : বন্দুকের মুখে লাগানো ধারালো ছুরি, bayonet.
> ভুজবল: অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারী দ্বারা ভুজবল শব্দটি বর্ণনা করা হয়েছে যেমন: "শারীরিক শক্তি ব্যবহার করে কোনো কাজ সম্পাদন করা"। 
> চারুপাঠ : চারু মানে সুন্দর। চারুকলা মানে সৌন্দর্য বিষয়ক পাঠ lesson. সৌন্দর্যশাস্ত্র। Fine arts.
> অপরাহত [ বিশেষণ / adjective ] পরাজিত বা পরাস্ত হয়নি এমন। যে হেরে যায়নি।
> পততি পতত্রে বিচলিত পত্রে শঙ্কিতভবদুপযানম্ |
রচয়তি শয়নং সচকিতনয়নং পশ্যতি তব পন্থানম্ ||৩||
[ জয়দেবের গীতগোবিন্দ, (দ্বাদশ শতক), পঞ্চম সর্গ, সাকাঙ্ক্ষ পুণ্ডরীকাক্ষ ] 
= বাংলা অনুবাদ:
মর্ম্মরে পাতা, কিবা / পাখী উড়ে গহনে,
তুমি এলে ভেবে চায় চকিতে /
পাতি শেষ সযতনে  / সচকিত নয়নে, /
চাহে তব পথ-পানে ত্বরিতে | ৩
[ কবি বিজয়চন্দ্র মজুমদারের বঙ্গানুবাদ, (আশ্বিন ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, অক্টোবর ১৯২৫) ]
> মুগ্ধবোধ: বোপদেবের রচিত ব্যাকরণ গ্রন্থ গুলির মধ্যে মুগ্ধবোধ-ই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। 
> ভোপদেব: ( জন্ম: ১১৫০, মারা গেছেন: ১২৪০) ভোপদেব ছিলেন একজন পণ্ডিত, কবি, চিকিৎসক এবং ব্যাকরণবিদ । তাঁর রচিত ব্যাকরণের বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুগ্ধবোধ'। কবিকল্পদ্রুম এবং তাঁর লেখা আরও অনেক বই বিখ্যাত। তিনি 'হেমাদ্রি' - এর সমসাময়িক ছিলেন এবং দেবগিরির যাদব রাজার দরবারে একজন স্বীকৃত পণ্ডিত ছিলেন । তার সময়কে ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ বলে মনে করা হয়।
> ভবভূতি : ভবভূতি ছিলেন একজন মহান সংস্কৃত কবি এবং শ্রেষ্ঠ নাট্যকার । তাঁর নাটকগুলি কালিদাসের নাটকের সমতুল্য বলে মনে করা হয় । ভবভূতি মহাবীরচরিতের ভূমিকায় নিজের সম্পর্কে লিখেছেন । তিনি বিদর্ভ দেশের 'পদ্মপুর' নামক স্থানের বাসিন্দা শ্রী ভট্টগোপালের নাতি ছিলেন । Bhavabhūti (Devanagari: भवभूति) was an 8th-century scholar of India noted for his plays and poetry, written in Sanskrit. His plays are considered the equal of the works of Kalidasa. 
> হা হতোস্মি [ ক্রিয়া / verb ] : আমি মারা গেলাম। হা হতোস্মি করা নিরাশ হয়ে 'মারা গেলাম' বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা। (সংস্কৃত হতঃ + অস্মি) 

প্রশ্ন - উত্তর: (নানা বিদ্যার আয়োজন)


[১] ঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখ: [ প্রত্যেকটি প্রশ্নের মান বা marks ১ বা 1. ]

ক) "এই মেডিকেল কলেজের ছাত্রমহাশয়ের স্বাস্থ্য এমন অত্যন্ত অন্যায়রূপে ভালে ছিল...।"-- এই ছাত্রটির নাম কী ছিল?
i) সীতানাথ দত্ত, ii) নীলকমল ঘোষাল, iii) হেরম্ব তত্ত্বরত্ন, iv) অঘোরবাবু ।

খ) "যে-রবিবারে সকালে তিনি না আসিতেন, সে-রবিবার আমার কাছে রবিবার বলিয়াই মনে হইত না।" -- 'তিনি' কে?
i) সেজদা, ii) অঘোরবাবু, iii) বিষ্ণু, iv) সীতানাথ দত্ত।

গ) বালক রবীন্দ্রনাথ কার কাছে গান শিখতেন?
i) সীতানাথ দত্ত, ii) বিষ্ণু, iii) নীলকমল ঘোষাল, iv) প্যারি সরকার।

ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কার সাথে কুস্তি করতে হত?
i) নীলকমল ঘোষাল, ii) অঘোরবাবু,  iii) হেরম্ব তত্ত্বরত্ন, iv) কানা পালোয়ান।

ঙ) "মানুষের পক্ষে সকলের চেয়ে বড়ো উদ্‌ভাবন।" পাঠে যেরকম বলা আছে (as it's in lesson) সেই মতে মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কী?

i) অস্থিবিদ্যা, ii) গান,  iii) বস্তুবিচার, iv) আগুন।

চ) “এমন সময় বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা যেন হঠাৎ আছাড় খাইয়া হা হতোস্মি করিয়া পড়িয়া গেল ।” — কাকে দেখে এমন অবস্থা হোত ?
(i) নীলকমল ঘোষাল, (ii) সীতানাথ দত্ত, (iii) হেরম্ব তত্ত্বরত্ন, (iv) অঘোরবাবু

** উত্তর **
ক) iv) অঘোরবাবু । খ) iv) সীতানাথ দত্ত । গ) ii) বিষ্ণু । ঘ) iv) কানা পালোয়ান। ঙ) iv) আগুন। চ) iv) অঘোরবাবু 


[২] কম-বেশি ২০টি শব্দে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : [ প্রতিটি প্রশ্নের মান ১ বা marks 1 ]

ক) "শ্রীযুক্ত নীলকমল ঘোষাল মহাশয় বাড়িতে আমাদের পড়াইতেন।"-- নীলকমল মহাশয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোটবেলায় কী কী বিষয় পড়াত?
উত্তর:  নীলকমল মহাশয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোটবেলায় সকাল ছটা হইতে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত পড়াত। তার কাছে রবীন্দ্রনাথ নানান বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছিল। চারুপাঠ, বস্তুবিচার, প্রাণিবৃত্তান্ত থেকে শুরু করে কবি মাইকেলের মেঘনাদবধকাব্য পর্যন্ত সবকিছুই রবি ঠাকুরকে তিনি পড়িয়েছিলেন।

খ) “দৈবদুর্যোগে-অপরাহত সেই কালো ছাতাটি দেখা দিয়াছে।” – “সেই কালো ছাতাটি’ কার ?
উত্তর: মেডিকেল কলেজের ছাত্র অঘোরবাবুর। তিনি জল বৃষ্টি ঝড়ে অপরাহত অর্থাৎ হারতেন না। ছাতা নিয়ে হলেও বালক রবিকে সন্ধ্যেবেলা ইংরেজি পড়াতে আসতেন।

গ) লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পড়ানোর বিষয়ে কার উৎসাহ বেশি ছিল 'নানা বিদ্যার আয়োজন' রচনাটি অনুসারে সংক্ষেপে লেখ। 
উত্তর: নানা বিচিত্র (surprising) বিষয়ে বালক রবীন্দ্রনাথকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তার সেজোদাদা উৎসাহ দিতেন। স্কুলে যা পড়ানো হত তার চেয়ে অনেক বেশি পড়তে হত বাড়িতে।

ঘ) "তখন নর্মাল স্কুলের একটি শিক্ষক, শ্রীযুক্ত নীলকমল ঘোষাল মহাশয় বাড়িতে আমাদের পড়াইতেন।"-- নীলকমল ঘোষালের শারীরিক বর্ণণা দাও।
উত্তর: নীলকমল ঘোষাল মহাশয় ছিল শুকনো চেহারের রোগাটে মানুষ। কিন্তু গলার স্বর ছিল তীক্ষ্ম। তাঁকে দেখলে মনে হত একটি বেত গাছ যেন মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছে।

ঙ) ছোটবেলায় রবি ঠাকুরকে কে কুস্তি শেখাত? 
উত্তরে: ভোরে অন্ধকার থাকতেই বালক রবীন্দ্রনাথকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হত। তারপরে লেংটি পরার পর কানা পালোয়ানের সাথে কুস্তি করতে হত। 



[৩] কমবেশি ৬০ টি শব্দে (word) উত্তর দাও: [ প্রশ্নের মান বা marks ৩ বা 3 ]

🔸ক) "কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় পাখিরা আলো জ্বালিতে পারে না, এটা যে পাখির বাচ্ছাদের পরম সৌভাগ্য এ কথা আমি মনে না করিয়া থাকিতে পারি না।" লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথা কেন বলেছেন?

🔹উত্তর: মেডিকেল কলেজের ছাত্র অঘোরবাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পড়াতে আসতেন সন্ধ্যাবেলা। ছোটবেলায় সেটা তাঁর পছন্দ হত না। তিনি মনে করতেন মানুষের আগুন আবিষ্কার (invention) যত বড়ই হোক না কেন এটা তাঁর জন্য অসুবিধার। কারণ আগুন আছে বলেই ইচ্ছে না থাকলেও তাঁকে সন্ধ্যেবেলা লণ্ঠন জ্বালিয়ে পড়াশোনা কর‍তে হত। অন্যদিকে পাখিরা আগুন আবিষ্কার করতে পারেনি তাই পাখির বাচ্চাদের ভাগ্য খুব ভালো যে সন্ধ্যাবেলায় তাদের পড়াশোনা করতে হয় না। 

🔸খ) "যে-রবিবারে সকালে তিনি না আসিতেন, সে-রবিবার আমার কাছে রবিবার বলিয়াই মনে হইত না।" -- 'তিনি' কে? তার অনুপস্থিতির (absence) দিনটি 'রবিবার বলিয়াই মনে হইত না' কেন? 

🔹উত্তর: ছোটবেলায় বালক রবিকে সীতানাথ মহাশয় প্রতি রবিবার বৈজ্ঞানিক যন্ত্র (scientific instrument) দিয়ে প্রাকৃতবিজ্ঞান (environmental science) পড়াতেন। বালক রবি তার কাছে শিখেছিলেন জল ফোটানোর সময় কী করে জল গরম হলে পাতলা হয়ে ওপরে ওঠে যায় আর ভারি জল নীচে নেমে আসে। দুধ গরম হলে তার মধ্যে থাকা জল বাষ্প (evaporation) হয়ে উড়ে যায় আর দুধ গরম হয়। এসবে জ্ঞান (knowledge) বিজ্ঞান  জেনে তিনি ভিষণ আনন্দ (enjoyed) পেতেন। তাই যেই রবিবার সীতানাথ বাবু আসতেন না সেদিন তার মন খারাপ হয়ে যেত। সেই দিনকে তার রবিবার মনে হত না।


🔸গ) “তাহার সরসতার উদাহরণ দিবার জন্য ....খানিকটা ইংরেজি তিনি মুগ্ধভাবে আমাদের কাছে আবৃত্তি করিয়াছিলেন ।” কীসের ‘সরসতা' (রস আছে এমন। মজাদার। funny, humerus) ? বক্তা কতোটা সার্থক হয়েছিলেন ? [১+২]
🔹 উত্তর: ইংরেজি ভাষার সরসতা। ইংরেজি ভাষা পড়তে বালক রবি মজা পেত না। তাঁর মনে হত এই ভাষা নীরস মানে রস নেই।
       
     অঘোরবাবু বালক রবীন্দ্রনাথকে একদিন একটি ইংরেজি কবিতা বা গদ্য খুব সুন্দর করে আবৃত্তি করে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে এই ভাষাটি সুন্দর ও মজাদার। তিনি বোঝাতে পারেননি। সেই আবৃত্তি শুনে মজা না পেয়ে ছাত্ররা এত হেসেছিল যে অঘোরবাবু আর চেষ্টা করেননি।


[ ৪ ] বড় প্রশ্ন: কমবেশি ১৫০ টি শব্দে উত্তর দাও। [ প্রশ্নের মান বা marks ৫ বা 5 ]

🔸ক) 'নানা বিদ্যার আয়োজন' রচনায় বালক রবির শিক্ষার যে আয়োজন (arrangement) করা হয়েছে তা সংক্ষেপে (briefly) বর্ণণা (describe) কর। 
🔹উত্তর: বালক রবিকে তাঁর সেজদাদা নানা বিষয়ে (subject) শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। স্কুলের পড়ার থেকে বাড়িতে অন্য বিষয়ে বেশি পড়তে হত। সকাল ছটা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত পড়াতেন নীলকমল ঘোষাল মহাশয়। ভোরে কুস্তি করে মাটিমাখা শরীরের ওপরে জামা পড়ে পদার্থবিদ্যা, মেঘনাদবধকাব্য, জ্যামিতি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল শিখতে হত।

রবিবার সকালে বিষ্ণুর কাছে গান শিখতেন রবি ঠাকুর। এছাড়া মাঝে মাঝে সীতানাথ দত্ত মহাশয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্র দিয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। বালক রবীন্দ্রনাথ এই রবিবারের বিজ্ঞান ক্লাস খুব পছন্দ করতেন। কারণ নতুন নতুন মজার বিষয় (information) জানতে পারতেন। 

বালক রবীন্দ্রনাথ ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলের একটি ছাত্রের কাছে হাড় বা অস্থি বিষয়ে শিখতেন। বোপদেবের লেখা সংস্কৃত ব্যাকরণ বই 'মুগ্ধবোধে'র সূত্র শেখাতেন হেরম্ব তত্ত্বরত্ন মহাশয়। তার মনে হয়েছে হাড়ের নামগুলো মুখস্থ করা বোপদেবের সংস্কৃত ব্যাকরণের থেকে অনেক সহজ ছিল।

সন্ধ্যার সময় ইংরেজি পড়াতেন আঘোরবাবু। ঝড় বৃষ্টি যে অসুবিধাই হোক তিনি পড়াতে চলে আসতেন। আর এই এই ক্লাস বালক রবি ঠাকুরের পছন্দ হত না। এইসময় তার খুব ঘুম পেত। এই ঘুম ঘুম অবস্থা দেখে তাঁর বড়দাদা ছুটি দিয়ে দিত। ছুটি হত রাত্রি নয়টার পর।


🔸খ) “এই শিক্ষাটি আমার কাছে বিশেষ ঔৎসুক্যজনক (interesting) ছিল।” — কোন্ শিক্ষা কেন বালক রবির কাছে উৎসাহজনক (interesting) ছিল ? [৫]
🔹উত্তর: প্রতি রবিবার বালক রবিকে প্রাকৃতবিজ্ঞান পড়াতে আসতেন সীতানাথ বাবু। তিনি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র (scientific apparatus) দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা (experiment) করে বিজ্ঞান শেখাতেন। এবং এইভাবে হাতেকলমে (practical) মজাদার পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন কিছু শিখতে খুব মজা পেত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তিনি সীতানাথ বাবুর কাছে শিখেছিলেন কীভাবে জল গরম হয়। আগুনের তাপে জলের পাত্রর (vessels) নীচের জল পাতলা হয়ে উপরে ওঠে। উপরের ভারি জল নীচে নেমে আসে। আর জল টগবগ করে ফোটে। সীতানাথ বাবু কাঁচের পাত্রে জলের মধ্যে কাঠের গুঁড়ো দিয়ে এই ব্যাপারটা হাতেকলমে দেখিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন রবীন্দ্রনাথ অবাক হয়ে গিয়েছিল।

দুধের মধ্যে জল থাকে। চুলায় জ্বাল দিলে জল বাষ্প (vapor) হয়ে উড়ে যায় বলেই দুধ ঘন হয়। সীতানাথ বাবু এইটা যেদিন হাতেকলমে দেখিয়ে দিয়েছিল সেদিন বালক রবি খুব আনন্দ পেয়েছিল। তাই সীতানাথ বাবু রবিবার না এলে সেই রবিবারকে রবিবারই মনে হত হত না রবীন্দ্রনাথের।