‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ --- পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা
রচনার ঐতিহাসিক পটভূমি
কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শুধু একটি দেশাত্মবোধক কবিতা নয়; এটি একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবতাবাদ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার জাগরণী সংগীত। কবিতাটি ১৯২৬ সালের মে মাসে কৃষ্ণনগরে রচিত। নির্ভরযোগ্য নজরুল-তথ্যসূত্রে রচনার তারিখ ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩, অর্থাৎ ২০ মে ১৯২৬ উল্লেখ আছে।
এই সময় ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। স্বাধীনতা আন্দোলন চললেও জাতীয় জীবনের ভিতরে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক বিভেদ ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল। ১৯২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে। এই দাঙ্গায় মানুষ ধর্মের পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। নজরুল এই পরিস্থিতিতে গভীরভাবে ব্যথিত হন। সেই সময়ের সংকটের প্রতিবাদ হিসেবেই কবিতাটির জন্ম।
২২ মে ১৯২৬ কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে নজরুল দিলীপকুমার রায় ও তাঁর সংগীতদলের সহযোগিতায় গানটি উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে পরিবেশন করেন। পরে এটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়।
কবিতার মূল প্রতীক---তরী ও কাণ্ডারী
সমগ্র কবিতাটি একটি বিস্তৃত রূপক। কবি ভারতবর্ষকে কল্পনা করেছেন একটি উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে চলা নৌকা বা ‘তরী’ হিসেবে। দেশ তখন পরাধীনতা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। সেই বিপজ্জনক তরীকে নিরাপদে তীরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যার হাতে, সে হল ‘কাণ্ডারী’---অর্থাৎ নৌকার হালধর; প্রতীকার্থে জাতির নেতা, দেশপ্রেমিক যুবসমাজ এবং সংগ্রামী নেতৃত্ব।
‘দুর্গম গিরি’, ‘কান্তার-মরু’, ‘দুস্তর পারাবার’---এসব বাস্তব ভৌগোলিক বাধা নয়; এগুলি স্বাধীনতার পথে থাকা অসংখ্য বিপদ ও প্রতিবন্ধকতার প্রতীক। রাত, ঝড়, উত্তাল জল, ছেঁড়া পাল---সবকিছু মিলিয়ে জাতির দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে।
যুবসমাজের প্রতি আহ্বান
কবি হতাশ হয়ে বসে থাকেননি। তিনি ডাক দিয়েছেন— “কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান”
অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরুণদেরই সংকটের সময় এগিয়ে আসতে হবে। এখানে ‘জোয়ান’ শুধু বয়সে তরুণ মানুষ নয়; সাহসী, কর্মক্ষম ও দায়িত্বশীল মানুষ বোঝায়। কবির কাছে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান শক্তি যুবসমাজ।
বঞ্চিত মানুষের অধিকার
দ্বিতীয় স্তবকে কবিতার রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুগের পর যুগ যারা বঞ্চিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত, তাদের বুকের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ একদিন আন্দোলনের রূপ নেবে। তাই কবি বলেন, তাদের বাদ দিয়ে মুক্তির সংগ্রাম সম্পূর্ণ হতে পারে না। তাদের সঙ্গে নিতে হবে এবং তাদের অধিকার দিতে হবে।
অর্থাৎ নজরুলের স্বাধীনতার ধারণা শুধু বিদেশি শাসন থেকে রাজনৈতিক মুক্তি নয়; সামাজিক ন্যায় ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাও স্বাধীনতার অপরিহার্য অংশ।
কবিতার সর্বশ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী মুহূর্ত
কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ— “হিন্দু না ওরা মুসলিম?”
এর উত্তরেই নজরুল তাঁর মানবতাবাদের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সংকটের মুহূর্তে মানুষটি হিন্দু না মুসলমান—এই প্রশ্ন কবির কাছে অর্থহীন। তাঁর উত্তর: মানুষ ডুবছে; সে মাতৃভূমির সন্তান।
অর্থাৎ ধর্মের পরিচয়ের আগে মানুষের পরিচয়। সাম্প্রদায়িক বিভেদ জাতিকে দুর্বল করে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে বিপথে নিয়ে যায়। এই কারণেই ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’কে শুধু স্বদেশপ্রেমের কবিতা বললে তার গভীরতা ধরা পড়ে না; এটি মূলত মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার কবিতা।
পলাশীর ইতিহাস ও জাতীয় আত্মসমালোচনা
পঞ্চম স্তবকে কবি নিয়ে এসেছেন পলাশীর প্রান্তর। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়। কবি তাই পলাশীকে শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি; এটি তাঁর কাছে জাতীয় পরাজয় ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।
‘ক্লাইভের খঞ্জর’ এবং ‘বাঙালীর খুন’—এই চিত্রকল্পে পরাধীনতার রক্তাক্ত ইতিহাস স্মরণ করিয়ে কবি বর্তমান প্রজন্মকে সতর্ক করেছেন। অতীতের বিভেদ ও বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ভবিষ্যৎও বিপন্ন হবে।
তবে কবি হতাশ নন। ‘ভারতের দিবাকর’ অস্তমিত হলেও আবার উদিত হবে—এই ‘রবি’ হল স্বাধীনতা ও জাতীয় জাগরণের প্রতীক। অর্থাৎ অতীতের পরাজয়ের পরে নতুন স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা কবিতায় প্রবল।
শহিদদের স্মরণ ও শেষ সতর্কবার্তা
শেষ স্তবকে ফাঁসির মঞ্চে আত্মবলিদানকারী স্বাধীনতাসংগ্রামীদের স্মরণ করা হয়েছে। তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে জাতির স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছেন। এখন জীবিতদের পরীক্ষা—তারা কি ‘জাতির’ মুক্তির জন্য কাজ করবে, নাকি ‘জাতের’ সংকীর্ণ বিভেদে আটকে থাকবে?
এখানেই কবিতার শেষ ও সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন। ‘জাতি’ মানে বৃহত্তর দেশ ও মানুষ; ‘জাত’ বোঝায় সংকীর্ণ সম্প্রদায়গত পরিচয়। তাই কবির কাছে প্রকৃত দেশপ্রেম মানে সকল মানুষের ঐক্য এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা।
কবিতার অন্তর্নিহিত বক্তব্য
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর বাহ্যিক কাহিনি একটি ঝড়ের মধ্যে নৌকা পার করার দৃশ্য। কিন্তু অন্তর্নিহিত অর্থ অনেক বিস্তৃত—
তরী = দেশ/জাতি
সমুদ্র = সংকটময় সময়
ঝড় = পরাধীনতা ও সামাজিক বিভেদ
কাণ্ডারী = নেতৃত্ব ও সংগ্রামী মানুষ
যাত্রী = সাধারণ দেশবাসী
তীর = স্বাধীনতা ও মুক্তি
পাল/হাল = সংগ্রামের শক্তি ও নেতৃত্ব
আলো/রবি = স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ।
এই প্রতীকগুলির মাধ্যমে নজরুল বলেছেন—দেশ যখন সংকটে, তখন ভয় পেলে চলবে না; বিভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।
কাব্যশিল্প
কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত উদ্দীপক, গতিশীল ও আবেগপূর্ণ। ‘দুলিতেছে’, ‘ফুলিতেছে’, ‘ছিঁড়িয়াছে’, ‘হাঁকিছে’, ‘ফেনাইয়া উঠে’—এই ক্রিয়াপদগুলি কবিতায় প্রবল গতি সৃষ্টি করেছে। প্রশ্নবোধক বাক্য, সম্বোধন এবং বারবার ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ উচ্চারণ কবিতাটিকে বক্তৃতা ও সংগীত—দুইয়ের শক্তি দিয়েছে।
রূপক, প্রতীক, ইতিহাস-চেতনা, অনুপ্রাস, চিত্রকল্প ও ধ্বনিময় শব্দপ্রয়োগ কবিতাটিকে জাগরণী সংগীতের মর্যাদা দিয়েছে। এর মূল সুর হল—ভয় নয়, বিভেদ নয়; ঐক্য, মানবতা, অধিকার ও মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া।
সুতরাং, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ একদিকে ১৯২৬ সালের সংকটময় ভারতবর্ষের দলিল, অন্যদিকে সর্বকালের মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা—জাতিকে বাঁচাতে হলে ধর্মীয় বা সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। এই মানবতাবাদী আবেদনই কবিতাটিকে শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
-------------------------------
কাণ্ডারী হুঁশিয়ার || কাজী নজরুল ইসলাম || প্রশ্ন উত্তর || মাধ্যমিক বাংলা দ্বিতীয় ভাষা || সাহিত্য সম্ভার || WBBSE
কঠিন শব্দের অর্থ
দুর্গম = যাতায়াত করা কঠিন
গিরি = পাহাড়
কান্তার = দুর্গম বন/প্রান্তর
মরু = মরুভূমি
দুস্তর = যা পার হওয়া কঠিন
পারাবার = সমুদ্র
লঙ্ঘিতে = অতিক্রম করতে
নিশীথ = গভীর রাত্রি
তরী = নৌকা
হিম্মৎ = সাহস
জোয়ান = যুবক/তরুণ
আগুয়ান = যে সামনে এগিয়ে যায়
তুফান = প্রবল ঝড়
তিমির = অন্ধকার
মাতৃমন্ত্র = দেশমাতৃকার মুক্তির আদর্শ/মন্ত্র
সান্ত্রী = প্রহরী
সঞ্চিত = জমা/সঞ্চয় করা
পুঞ্জিত = স্তূপীকৃত/জমাট
বঞ্চিত = অধিকার থেকে বঞ্চনা-প্রাপ্ত
অভিমান = মনের ক্ষোভ/অভিযোগ
সন্তরণ = সাঁতার কেটে পার হওয়া
কাণ্ডারী = নৌকার হালধর
মাতৃমুক্তিপণ = মাতৃভূমিকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা
গিরি-সংকট = কঠিন/সংকীর্ণ পর্বতপথ; রূপকে কঠিন সংকট
ভীরু = ভয় পায় যে
গরজায় = গর্জন করে
পশ্চাৎ = পিছনে
ত্যজিবে = ত্যাগ করবে
হানাহানি = পরস্পরের মধ্যে মারামারি/সংঘর্ষ
মহাভার = বিরাট দায়িত্ব
প্রান্তর = বিস্তীর্ণ মাঠ/ভূমি
খঞ্জর = ছুরি/ধারালো অস্ত্র
দিবাকর = সূর্য
রাঙিয়া = রাঙিয়ে
পুনর্বার = আবার
অলক্ষ্যে = অগোচরে/চোখের আড়ালে
বলিদান = আত্মত্যাগ
ত্রাণ = উদ্ধার/মুক্তি
হুঁশিয়ার = সাবধান
===============================
A. ঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো: (FM 1)
1. "বাঙালির খুনে লাল হলো যেথা ক্লাইভের খঞ্জর।" ---কোন যুদ্ধে 'ক্লাইভের খঞ্জর' লাল হয়েছিল?
ক) সিপাই বিদ্রোহ
খ) পলাশীর যুদ্ধ
গ) বক্সারের যুদ্ধ
ঘ) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
উত্তর : খ) পলাশীর যুদ্ধ
2. "অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া"---- ডুবে মরার কারণ কী?
(ক) নৌকা ডুবে যাওয়া
(খ) সাঁতার না জানা
(গ) ঝড় উঠা
(ঘ) বন্যা
উত্তর : (খ) সাঁতার না জানা
====================================
B. কম-বেশি ২০টি শব্দে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (FM 1)
1. "ইহাদেরে পথে নিতে হবে সাথে," --- কাদের সার্থে নিতে হবে?
উত্তর : ‘ইহাদের’ বলতে যুগ-যুগান্ত ধরে বঞ্চিত, নিপীড়িত ও অধিকারহীন সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে সঙ্গে নিতে হবে।
2. "যাত্রীরা হুঁশিয়ার।'কাণ্ডারি হুঁশিয়ার' কবিতায় কোন্ যাত্রীদের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে?
উত্তর : ‘যাত্রীরা’ বলতে বিপদসংকুল স্বাধীনতার পথে চলা পরাধীন ভারতবাসীকে বোঝানো হয়েছে, যাদের ভয় ও বিভেদ ত্যাগ করে সতর্ক থাকতে হবে।
3. "আসি অলক্ষে দাঁড়িয়েছে তারা," কারা অলক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে?
উত্তর : ‘তারা’ বলতে স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদানকারী বীর শহিদদের বোঝানো হয়েছে, যারা অদৃশ্যভাবে জাতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।
4. “কাণ্ডারি ! আজি দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ” – ‘মাতৃমুক্তিপণ’ কথাটির অর্থ কী ?
উত্তর : ‘মাতৃমুক্তিপণ’ বলতে পরাধীন মাতৃভূমিকে বিদেশি শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, সংকল্প বা শপথকে বোঝানো হয়েছে।
====================================
C. প্রসঙ্গ নির্দেশপূর্বক কম-বেশি ৬০টি শব্দে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (FM 3)
1. "ওই গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর।" --- প্রসঙ্গ উল্লেখ করে উদ্ধৃতিটির অর্থ পরিস্ফুট করো।
উত্তর :
পলাশীর পরাজয়ের ইতিহাস স্মরণ করে কবি বলেছেন, “ওই গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর।” এখানে ‘ভারতের দিবাকর’ বলতে ভারতের স্বাধীনতা, গৌরব ও জাতীয় শক্তির প্রতীককে বোঝানো হয়েছে। পলাশীর পরাজয়ে সেই গৌরবের সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। তবে পরের পঙ্ক্তিতে কবি পুনরায় স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের আশাবাদ প্রকাশ করেছেন এবং হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এই আশা জাতিকে সংগ্রামে এগিয়ে দেয়।
2. "অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া," 'অসহায় জাতি' কারা? তাদের ডুবে মরার কথা বলা হল কেন? [১+২]
উত্তর :
‘অসহায় জাতি’ বলতে পরাধীনতা, দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সাম্প্রদায়িক বিভেদে বিপর্যস্ত ভারতবাসীকে বোঝানো হয়েছে। তারা নিজেদের সংকট থেকে উদ্ধারের পথ জানে না বলেই কবি বলেছেন, তারা ‘ডুবে মরিছে’।
‘ডুবে মরা’ এখানে রূপক অর্থে ব্যবহৃত; পরাধীনতা ও জাতীয় দুর্দশার গভীরে তলিয়ে যাওয়াই এর অর্থ। তাই কাণ্ডারীর কাছে তাদের মুক্তির তীরে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই কারণেই কাণ্ডারীর সাহায্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
3. “পশ্চাৎ-পথযাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ !” - ‘পশ্চাৎ-পথযাত্রী’ কারা ? তাদের মনে সন্দেহ জাগে কেন? [১+২]
উত্তর :
‘পশ্চাৎ-পথযাত্রী’ বলতে স্বাধীনতার সংগ্রামের পথে এগিয়ে না গিয়ে ভয়, দুর্বলতা ও সংশয়ের কারণে পিছিয়ে যেতে চায় এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে।
চারদিকে প্রচণ্ড ঝড়, বিপদ, অন্ধকার এবং যাত্রীদের পারস্পরিক হানাহানি দেখে তাদের মনে ভয় ও সংশয় জন্মেছে। তারা আশঙ্কা করে, কাণ্ডারী হয়তো পথ ভুলবেন কিংবা মাঝপথে সংগ্রামের দায়িত্ব ত্যাগ করবেন। তাই কবি তাঁদের হতাশা ত্যাগ করে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে চলার বার্তা দিয়েছেন।
====================================
D. কম-বেশি ২০০ শব্দে উত্তর দাও (যে-কোনো একটি): (FM 7)
1. 'কান্ডারী হুঁশিয়ার' কবিতায় কবি কান্ডারীকে কীভাবে উৎসাহিত করেছেন? [৭]
উত্তর :
কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় কবি বিপদসংকুল সময়ে জাতির কাণ্ডারীকে সাহস, দৃঢ়তা ও কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কবিতায় ভারতবর্ষকে ঝড়ে বিপন্ন তরী এবং জাতির নেতাকে সেই তরীর কাণ্ডারী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার ও নিশীথরাত্রির উল্লেখ করে কবি স্বাধীনতার পথের কঠিন বাধাগুলি তুলে ধরেছেন।
তরী যখন দুলছে, জল ফুলে উঠছে, মাঝি পথ হারাচ্ছে এবং পাল ছিঁড়ে গেছে, তখনও কাণ্ডারীকে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। কবি সাহসী যুবকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে নেতৃত্বের শক্তি বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে যুগ-যুগান্ত ধরে বঞ্চিত মানুষের ব্যথা ও অভিমানকে সঙ্গে নিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।
কবির কাছে কাণ্ডারীর সবচেয়ে বড় কর্তব্য হল সংকীর্ণ ধর্মীয় বিভেদ ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাই ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’—এই প্রশ্নের পরিবর্তে ‘ডুবিছে মানুষ’—এই মানবিক সত্যকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন। পলাশীর পরাজয়ের ইতিহাস ও শহিদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে তিনি কাণ্ডারীকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রেরণা দিয়েছেন। প্রবল ঝড়, হানাহানি ও সন্দেহের মধ্যেও পথ না হারিয়ে তরীকে মুক্তির তীরে পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় আহ্বানই কবির মূল উৎসাহবাণী—‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’
2. “স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা নেতৃত্ব দেবে তাদের গুরু দায়িত্বের কথা কবি নজরুল কীভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ? [৭]
উত্তর :
কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাদের গুরুদায়িত্বের কথা ‘কাণ্ডারী’র প্রতীকের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কবি পরাধীন ভারতবর্ষকে ঝড়ের মধ্যে বিপন্ন একটি তরীর সঙ্গে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে সেই তরীর কাণ্ডারীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফলে জাতিকে নিরাপদে মুক্তির তীরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কাণ্ডারীর।
কবি বলেছেন, পথ দুর্গম, চারদিকে অন্ধকার, সমুদ্র উত্তাল, পাল ছিঁড়ে গেছে এবং মাঝি পথ হারানোর উপক্রম করেছে। এমন সংকটের সময় নেতৃত্বকে ভীত বা দুর্বল হলে চলবে না; দৃঢ় হাতে হাল ধরে এগিয়ে যেতে হবে। যুবসমাজকে সংগ্রামে আহ্বান জানিয়ে তাদের নেতৃত্বের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন।
নেতাদের আরও একটি গুরুদায়িত্ব হল যুগ-যুগ ধরে বঞ্চিত ও অধিকারহীন মানুষকে স্বাধীনতার পথে সঙ্গে নেওয়া এবং তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ধর্মীয় বিভেদও নেতাদের দূর করতে হবে। বিপন্ন মানুষ হিন্দু না মুসলমান—এই প্রশ্ন না করে তাকে প্রথমে মানুষ ও মাতৃভূমির সন্তান হিসেবে দেখতে হবে।
পলাশীর পরাজয় স্মরণ করিয়ে কবি অতীতের বিশ্বাসঘাতকতা ও জাতীয় দুর্বলতার পুনরাবৃত্তি না করার শিক্ষা দিয়েছেন। শহিদদের আত্মত্যাগও নেতাদের কর্তব্যের কথা স্মরণ করায়। তাই ঐক্য, মানবতা, অধিকার, সাহস ও অবিচল নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়াই তাঁদের প্রধান দায়িত্ব।
