Ticker

6/recent/ticker-posts

‘ঈশ্বর’ || কাজী নজরুল ইসলাম || আলোচনা || প্রশ্ন ও উত্তর || নবম শ্রেণী || সাহিত্য সম্ভার || বাংলা দ্বিতীয় ভাষা || WBBSE

 


‘ঈশ্বর’ || কাজী নজরুল ইসলাম || আলোচনা || প্রশ্ন ও উত্তর || নবম শ্রেণী || সাহিত্য সম্ভার || বাংলা দ্বিতীয় ভাষা || WBBSE 

• কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন, রাজনীতি, দর্শন ও সাহিত্যকর্ম

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক অনন্য ও যুগান্তকারী প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। তাঁকেই বাংলা সাহিত্যের একমাত্র ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে।

•• জীবন ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র কাজী পরিবারে নজরুলের জন্ম। শৈশবে পিতৃহীন হয়ে জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক ও সুরসাধনার যাত্রা শুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৭-১৯১৯) তিনি ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে করাচি যান, যা তাঁর অভিজ্ঞতা ও চেতনাকে পরিপক্ব করে তোলে।

•• রাজনীতি ও বিপ্লবী চেতনা

নজরুলের রাজনৈতিক চেতনা ছিল আপসহীন ও বৈপ্লবিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বরাজ বা পূর্ণ স্বাধীনতা আন্দোলন কোনো আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে না; তার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজন। ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে তীব্র লেখনি চালান। তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তিনি রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড ভোগ করেন। জেলখানায় ৪০ দিন অনশন করে তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিবাদের চরম পরাকাষ্ঠা দেখান।

•• দর্শন: সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতা

নজরুলের জীবনের মূল দর্শন ছিল সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতিভেদ এবং শোষণের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেছেন। তাঁর দর্শনে ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট উপাসনালয়ে বা শাস্ত্রে সীমাবদ্ধ নন, বরং মানুষের অন্তরে ও সমগ্র সৃষ্টিতে বিরাজমান। ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

•• সাহিত্যকর্ম ও অবদান

নজরুলের সাহিত্য ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২), ‘বিষের বাঁশি’, ‘সাম্যবাদী’ এবং ‘সর্বহারা’ অন্যতম। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক চিরন্তন বিপ্লবের প্রতীক। কবিতার পাশাপাশি তিনি প্রায় তিন হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন, যা ‘নজরুল গীতি’ নামে খ্যাত। তিনি আধুনিক বাংলা গানে নতুন মাত্রা যুক্ত করেন এবং প্রচুর ইসলামিক গজল ও শ্যামাসংগীত রচনা করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

উপসংহারে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন শোষিত, বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং এক মুক্ত মানবতাবাদী সত্তা।

--------------------------------------------------------------

কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতার আলোচনা

• কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতার আলোচনা

•• ভূমিকা

বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় মানবতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্ত চিন্তার আদর্শকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ‘ঈশ্বর’ কবিতাটি ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এই কাব্যগ্রন্থে কবি ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও শ্রেণির ভেদাভেদ দূর করে মানুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ‘ঈশ্বর’ কবিতাতেও সেই মানবতাবাদী ও সাম্যবাদী চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। কবিতাটির প্রধান বিষয় হল ঈশ্বরকে কোথায় এবং কীভাবে পাওয়া যায়। কবির মতে, ঈশ্বরকে দূরের আকাশে, পাহাড়ে, জঙ্গলে বা কেবল ধর্মগ্রন্থের পাতায় খুঁজে বেড়ালে তাঁকে পাওয়া যায় না; বরং মানুষের নিজের মধ্যে, সকল মানুষের মধ্যে এবং সমগ্র সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর প্রকাশ উপলব্ধি করা সম্ভব।

•• বাহ্যিক ঈশ্বরসন্ধানের অসারতা

কবিতার শুরুতেই কবি একজন ঈশ্বরসন্ধানী মানুষকে সম্বোধন করে প্রশ্ন করেছেন—

“কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’,

কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?”

ঈশ্বরকে পাওয়ার আশায় সেই ব্যক্তি আকাশ-পাতাল, বন-জঙ্গল ও পাহাড়-চূড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবি তাঁকে ‘ঋষি’ ও ‘দরবেশ’ নামে সম্বোধন করেছেন। এই দুটি শব্দ যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মীয় সাধনার পরিচয় বহন করে। এর দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ঈশ্বরের সন্ধান কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের একার বিষয় নয়; সকল ধর্মের মানুষই ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়ায়।

কিন্তু কবির প্রশ্ন হল—যাঁকে মানুষ এত দূরে খুঁজছে, তিনি কি সত্যিই এত দূরে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কবি বলেছেন—

“বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।”

এখানে ‘বুকের মানিক’ বলতে মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অমূল্য সত্তা, মানবিক চেতনা বা ঈশ্বরীয় প্রকাশকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ নিজের অন্তরের সেই অমূল্য সত্যকে সঙ্গে নিয়েই বাইরে বাইরে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়ায়। অর্থাৎ, যার সন্ধান মানুষ দেশ-দেশান্তরে করে বেড়ায়, তাঁর উপস্থিতি মানুষের নিজের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু নিজের অন্তরের সত্যকে চিনতে না পারার কারণেই মানুষ তাঁকে দূরে খুঁজে বেড়ায়।

•• সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক

পরবর্তী অংশে কবি আরও গভীরভাবে বলেছেন—

“সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,

স্রষ্টারে খোঁজো—আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!”

সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মানুষের সামনে উপস্থিত, অথচ মানুষ সেই সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার পরিচয় উপলব্ধি না করে চোখ বন্ধ করে তাঁকে খুঁজে বেড়ায়। এখানে ‘চোখ বুঁজে’ কথাটি শুধু শারীরিকভাবে চোখ বন্ধ করাকে বোঝায় না; এটি মানুষের অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা, কুসংস্কার এবং আত্ম-অচেতনতার প্রতীক।


কবি বলেছেন, মানুষ স্রষ্টাকে খুঁজতে গিয়ে আসলে নিজেকেই খুঁজে বেড়ায়। কারণ নিজের অস্তিত্ব, নিজের বিবেক ও নিজের অন্তরের মধ্যেই স্রষ্টার সৃষ্টির চিহ্ন রয়েছে। তাই প্রকৃত ঈশ্বরসন্ধানের সঙ্গে আত্মসন্ধান ও আত্মপরিচয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিজেকে না চিনে, নিজের অন্তরের সত্যকে উপলব্ধি না করে বাইরে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়ানো অর্থহীন।

•• আত্মজ্ঞান ও ঈশ্বরের উপলব্ধি

কবি মানুষকে ‘ইচ্ছা-অন্ধ’ বলে সম্বোধন করেছেন—


“ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেখ দর্পণে নিজ-কায়া,

দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে প’ড়েছে তাঁহার ছায়া।”


‘ইচ্ছা-অন্ধ’ বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যার চোখ থাকলেও সে সত্যকে দেখতে চায় না। নিজের ধারণা, কুসংস্কার ও সংকীর্ণ চিন্তার কারণে মানুষ মনে করে যে ঈশ্বরকে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বা বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে। কবি সেই মানসিক অন্ধত্ব দূর করার জন্য ‘আঁখি খোলো’ বলে আহ্বান জানিয়েছেন।


‘দর্পণে নিজ-কায়া’ দেখার অর্থ নিজের প্রকৃত সত্তাকে চেনা। এখানে দর্পণ আত্মপরিচয় ও আত্মজ্ঞান-এর প্রতীক। মানুষ নিজের শরীর, প্রাণ, বিবেক ও অস্তিত্বের মধ্যে স্রষ্টার ছায়া উপলব্ধি করতে পারে। কবি অবশ্য মানুষকেই সম্পূর্ণ ঈশ্বর বলেছেন—এমন নয়; তিনি বলতে চেয়েছেন যে মানুষের অস্তিত্বে স্রষ্টার সৃষ্টি ও তাঁর প্রকাশের চিহ্ন রয়েছে।


•• সকলের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ


কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পঙ্‌ক্তি হল—


“সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!”


এই পঙ্‌ক্তিতে নজরুলের সর্বজনীন মানবতাবাদী চেতনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ঈশ্বর কোনো বিশেষ ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় বা ব্যক্তির সম্পত্তি নন। তিনি কেবল সাধু, পণ্ডিত বা ধনী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; সকল মানুষের মধ্যেই তাঁর প্রকাশ রয়েছে।


এই ভাবনার মধ্যেই কবিতার সাম্যবাদী চেতনা নিহিত রয়েছে। যখন ঈশ্বর সকলের মধ্যে বিরাজমান, তখন মানুষে মানুষে উচ্চ-নীচ, জাতি-বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ সৃষ্টি করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরের প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করা সম্ভব।


এই ভাবটি কবির পরবর্তী পঙ্‌ক্তিতেও প্রকাশিত হয়েছে—


“আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!”


মানুষ ঈশ্বরকে চোখে দেখেনি, কিন্তু নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করে। নিজের মধ্যে সৃষ্টির পরিচয় দেখে মানুষ অদৃশ্য স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে। এখানে ঈশ্বরকে যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করার চেয়ে অনুভব ও উপলব্ধির মাধ্যমে তাঁকে চেনার কথাই বলা হয়েছে।


•• শাস্ত্রবিদদের প্রতি কবির ব্যঙ্গ


কবিতার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশে কবি বলেছেন—


“শিহরি’ উঠো না, শাস্ত্রবিদের ক’রো না ক’ বীর, ভয়—

তাহারা খোদার খোদ্‌ ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!”


এই কথাগুলিতে কবির তীব্র ব্যঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে। কবি ধর্মকে আক্রমণ করেননি; তিনি আক্রমণ করেছেন সেইসব মানুষের অহংকারকে, যারা নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞান ও শাস্ত্রপাণ্ডিত্যের কারণে ঈশ্বরের একমাত্র প্রতিনিধি বলে মনে করে।


‘খোদার প্রাইভেট সেক্রেটারী’ কথাটির মাধ্যমে কবি অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে বোঝাতে চেয়েছেন যে কোনো শাস্ত্রবিদ বা ধর্মীয় পণ্ডিত ঈশ্বরের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি নন। কেউ ধর্মগ্রন্থের অনেক কথা জানে বলেই সে ঈশ্বরের সমস্ত সত্য জেনে ফেলেছে—এমন দাবি করা যায় না। ঈশ্বরকে জানার অধিকার কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।


•• শাস্ত্রজ্ঞান ও সত্যোপলব্ধি


কবিতার শেষাংশে কবি ‘রত্ন’ ও ‘রত্নাকর’-এর রূপকের সাহায্যে বাহ্যিক জ্ঞান এবং প্রকৃত সত্যোপলব্ধির পার্থক্য বোঝিয়েছেন—


“রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে—

রত্নাকরের খবর তা ব’লে পুছো না ওদের ভুলে’।”


রত্নের ব্যবসায়ীরা রত্ন চেনে এবং রত্ন নিয়ে ব্যবসা করে। কিন্তু তারা রত্ন চিনতে পারে বলেই যে রত্নের উৎস বা রত্নভাণ্ডারের গভীরতা সম্পর্কে সব জানে, এমন নয়। এই সাধারণ উদাহরণের মাধ্যমে কবি একটি গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন।


এখানে ‘রত্ন’ বলতে ধর্মীয় জ্ঞান, শাস্ত্রের তথ্য বা বাহ্যিক পাণ্ডিত্যকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘রত্নাকর’ বলতে গভীর সত্যের অসীম ভাণ্ডারকে বোঝানো হয়েছে। কেউ শাস্ত্রের অনেক কথা জানলেই যে সে ঈশ্বরের গভীর সত্য উপলব্ধি করেছে, তা নয়।


এই বক্তব্যকে আরও স্পষ্ট করে কবি বলেছেন—


“উহারা রত্ন-বেনে,

রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!”


‘রত্ন-বেনে’ অর্থাৎ রত্নের ব্যবসায়ীরা রত্ন চিনতে পারে বলেই মনে করে যে তারা রত্নাকরকেও চিনে ফেলেছে। তেমনি ধর্মীয় পাণ্ডিত্যে গর্বিত মানুষ অনেক সময় মনে করে যে শাস্ত্রের জ্ঞান থাকলেই ঈশ্বরের প্রকৃত সত্যকে জানা সম্ভব। কবি এই ধারণার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, তথ্য জানা এবং সত্য উপলব্ধি করা একই বিষয় নয়।


•• সত্য-সিন্ধুতে ডুব দেওয়ার আহ্বান


কবিতার শেষে কবি বলেছেন—


“ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,

শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।”


এই পঙ্‌ক্তিতে কবি শাস্ত্রকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। তিনি বলতে চেয়েছেন যে শুধু শাস্ত্রের পাতা ঘেঁটে, উদ্ধৃতি মুখস্থ করে বা বাহ্যিক পাণ্ডিত্য অর্জন করলেই সত্যকে উপলব্ধি করা যায় না। প্রকৃত সত্যকে জানতে হলে তার গভীরে প্রবেশ করতে হয়।


‘সত্য-সিন্ধু’ এখানে গভীর ও চরম সত্যের প্রতীক। আর ‘ডুব দেওয়া’ বলতে আত্মঅনুসন্ধান, সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, মানবিকতার চর্চা এবং সংকীর্ণতা ত্যাগ করাকে বোঝানো হয়েছে। কবি মানুষকে শুধু পড়তে বা জানতে বলেননি; তিনি সত্যকে অনুভব করতে ও উপলব্ধি করতে বলেছেন।


•• কবিতার সামগ্রিক ভাব


সমগ্র কবিতাটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কবির চিন্তার একটি সুস্পষ্ট গতিপথ রয়েছে। মানুষ প্রথমে ঈশ্বরকে বাইরে—আকাশে, পাহাড়ে, বনে ও বিভিন্ন স্থানে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কবি তাকে ধীরে ধীরে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনেন। নিজের দেহ ও অন্তরের মধ্যে স্রষ্টার ছায়া দেখতে শেখান। তারপর তিনি দেখান যে ঈশ্বর শুধু নিজের মধ্যে নন, সকল মানুষের মধ্যেই প্রকাশিত। সবশেষে মানুষকে বাহ্যিক জ্ঞান ও ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের সীমা অতিক্রম করে গভীর সত্যের মধ্যে প্রবেশ করার আহ্বান জানান।


অতএব ‘ঈশ্বর’ কবিতাটি বাহিরমুখী ঈশ্বরসন্ধান থেকে অন্তর্মুখী আত্মসন্ধান এবং মানবমুখী সত্যোপলব্ধির দিকে যাত্রার কবিতা।


•• উপসংহার


কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতা কেবল ধর্মীয় ভাবনার কবিতা নয়; এটি মানবতা, আত্মজ্ঞান, অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের কবিতা। কবি দেখিয়েছেন যে ঈশ্বরকে দূরের কোনো স্থানে খুঁজে বেড়ানোর আগে মানুষের নিজের অন্তরকে চিনতে হবে এবং সকল মানুষের মধ্যে তাঁর প্রকাশ উপলব্ধি করতে হবে। কোনো শাস্ত্রবিদ বা ধর্মীয় পণ্ডিত ঈশ্বরের একমাত্র প্রতিনিধি নন এবং শুধু শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন করলেই সত্যকে জানা যায় না।


কবিতাটির মূল শিক্ষা হল—মানুষ যেন ঈশ্বরকে খুঁজতে গিয়ে মানুষকেই ভুলে না যায়। যে ব্যক্তি নিজের অন্তরকে চিনতে পারে না এবং অন্য মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ দেখতে পারে না, তার ঈশ্বরসন্ধান অসম্পূর্ণ। আত্মঅনুসন্ধান, মানবপ্রেম, সাম্যবোধ এবং সত্যের গভীর উপলব্ধির মধ্য দিয়েই প্রকৃত ঈশ্বরচেতনা লাভ করা সম্ভব। এই মানবতাবাদী ও সাম্যবাদী আদর্শই ‘ঈশ্বর’ কবিতার মূল তাৎপর্য।


---------------------------------------------------------------


A. ঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো: [FM 1]


১. ‘ঈশ্বর’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?

ক) অগ্নিবীণা

খ) বিষের বাঁশি

গ) সাম্যবাদী

ঘ) সর্বহারা


উত্তর: গ) সাম্যবাদী

---

২. ‘কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই’—এখানে ‘জগদীশ’ শব্দটির অর্থ কী?

ক) মানুষ

খ) ঈশ্বর

গ) সাধু

ঘ) কবি


উত্তর: খ) ঈশ্বর

---

৩. ঈশ্বরসন্ধানী ব্যক্তি কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন?

ক) শহর ও নগরে

খ) নদী ও সমুদ্রে

গ) বন-জঙ্গল ও পাহাড়-চূড়ায়

ঘ) মন্দির ও মসজিদে


উত্তর: গ) বন-জঙ্গল ও পাহাড়-চূড়ায়

---

৪. ‘দেখ দর্পণে নিজ-কায়া’—এখানে ‘দর্পণ’ কীসের প্রতীক?

ক) সৌন্দর্যের

খ) আত্মপরিচয়ের

গ) সম্পদের

ঘ) জ্ঞানের


উত্তর: খ) আত্মপরিচয়ের

---

৫. “তোমারি সব অবয়বে প’ড়েছে তাঁহার ছায়া”—‘তাঁহার’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?

ক) ঋষিকে

খ) শাস্ত্রবিদকে

গ) স্রষ্টাকে

ঘ) জগদীশ ভাইকে


উত্তর: গ) স্রষ্টাকে

---

৬. কবি ‘শাস্ত্রবিদদের’ কোন নামে ব্যঙ্গ করেছেন?

ক) সত্যের রক্ষক

খ) খোদার ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’

গ) জ্ঞানের সাগর

ঘ) রত্নাকর


উত্তর: খ) খোদার ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’


---


৭. ‘রত্ন-বেনে’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?

ক) রত্ন সংগ্রহকারীদের

খ) রত্নের ব্যবসায়ীদের

গ) সমুদ্রযাত্রীদের

ঘ) সাধু-সন্ন্যাসীদের


উত্তর: খ) রত্নের ব্যবসায়ীদের

---

৮. কবিতায় ‘রত্নাকর’ কীসের প্রতীক?

ক) পাহাড়ের

খ) ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের

গ) গভীর সত্যের অসীম ভাণ্ডারের

ঘ) মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের


উত্তর: গ) গভীর সত্যের অসীম ভাণ্ডারের

---

৯. “শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও”—কবি কীসে ডুব দিতে বলেছেন?

ক) রত্নাকরে

খ) সমুদ্রে

গ) সত্য-সিন্ধু-জলে

ঘ) জ্ঞানের সাগরে


উত্তর: গ) সত্য-সিন্ধু-জলে

---

১০. ‘ঈশ্বর’ কবিতায় কবির প্রধান বক্তব্য কোনটি?

ক) পাহাড়ে ঈশ্বরের বাস

খ) শাস্ত্র মুখস্থ করাই ঈশ্বরলাভের একমাত্র পথ

গ) সকলের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ রয়েছে

ঘ) সাধুদের অনুসরণ করলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়


উত্তর: গ) সকলের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ রয়েছে


---------------------------------------------------------------


B. কম-বেশি ২০টি শব্দে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: [FM 1]


••• ১. ‘ঈশ্বর’ কবিতায় কবি কাকে ‘ইচ্ছা-অন্ধ’ বলেছেন?


কবি সেই ঈশ্বরসন্ধানী মানুষকে ‘ইচ্ছা-অন্ধ’ বলেছেন, যে নিজের অন্তর ও সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ উপলব্ধি না করে বাইরে তাঁকে খুঁজে বেড়ায়।


••• ২. ‘বুকের মানিক’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?


‘বুকের মানিক’ বলতে মানুষের অন্তরে নিহিত অমূল্য মানবিক ও ঐশ্বরিক সত্তাকে বোঝানো হয়েছে, যার উপস্থিতি মানুষ উপলব্ধি না করেই বাইরে ঈশ্বরের সন্ধান করে।


••• ৩. ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ কথাটির তাৎপর্য কী?


‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ কথাটির মাধ্যমে কবি ব্যঙ্গ করে বলেছেন যে শাস্ত্রবিদেরা ঈশ্বরের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি নন এবং তাঁর সমস্ত ইচ্ছার একমাত্র ব্যাখ্যাকারও নন।


••• ৪. ‘রত্নাকর’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?


‘রত্নাকর’ বলতে রত্নের বিশাল ভাণ্ডার বা সমুদ্রকে বোঝানো হয়েছে। কবিতায় এটি গভীর, অসীম ও ঈশ্বরীয় সত্যের ভাণ্ডারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।


••• ৫. ‘সত্য-সিন্ধু’তে ডুব দেওয়া বলতে কী বোঝায়?


‘সত্য-সিন্ধু’তে ডুব দেওয়া বলতে বাহ্যিক শাস্ত্রজ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আত্মঅনুসন্ধান, মানবিকতা এবং গভীর সত্যকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করাকে বোঝায়।


••• ৬. “বুকের মানিকে বুকে ধ’রে”—কবি কেন এই কথা বলেছেন?


মানুষ নিজের অন্তরে ঈশ্বরীয় সত্তা ও সত্যের অমূল্য সম্পদ ধারণ করেও তা উপলব্ধি করতে পারে না বলে বাইরে দেশ-দেশান্তরে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়ায়।


••• ৭. কবিতায় ‘আঁখি খোলো’ কথাটির তাৎপর্য কী?


‘আঁখি খোলো’ বলতে কবি অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার অন্ধত্ব দূর করে জ্ঞান ও বিবেকের সাহায্যে নিজের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ উপলব্ধি করতে বলেছেন।


••• ৮. “রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে”—কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?


কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে ধর্মগ্রন্থের কিছু তথ্য বা বাহ্যিক জ্ঞান জানলেই গভীর সত্য ও ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না।


••• ৯. কবি কেন ঈশ্বরকে ‘অদেখা জন্মদাতা’ বলেছেন?


ঈশ্বরকে মানুষ প্রত্যক্ষভাবে চোখে দেখতে পায় না, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব ও সৃষ্টির পরিচয়ের মাধ্যমে অদৃশ্য স্রষ্টার উপস্থিতি অনুভব করতে পারে বলেই কবি তাঁকে বলেছেন ‘অদেখা জন্মদাতা’।


••• ১০. ‘সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে’—কথাটির অর্থ কী?


সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মানুষের সামনে তার সৌন্দর্য ও রহস্য নিয়ে উপস্থিত রয়েছে, অথচ মানুষ সেই সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার পরিচয় উপলব্ধি না করে অন্ধভাবে তাঁকে খুঁজে বেড়ায়।


---------------------------------------------------------------


C. প্রসঙ্গ নির্দেশপূর্বক কম-বেশি ৬০টি শব্দে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: [FM 3]


••• ১. “স্রষ্টারে খোঁজো—আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!” — কথাটির তাৎপর্য কী?


প্রসঙ্গ : উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতা থেকে গৃহীত। ঈশ্বরসন্ধানী মানুষকে উদ্দেশ করে কবি এই কথাটি বলেছেন।


তাৎপর্য : মানুষ ঈশ্বরকে খুঁজতে আকাশ-পাতাল, বন-জঙ্গল ও পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কবির মতে, স্রষ্টার সন্ধানের সঙ্গে আত্মসন্ধানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের নিজের অস্তিত্ব, বিবেক ও অন্তরের মধ্যেই স্রষ্টার সৃষ্টির পরিচয় আছে। তাই নিজেকে ও নিজের অন্তরের সত্যকে না চিনে বাইরে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়ানো অর্থহীন। আত্মজ্ঞান ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমেই স্রষ্টার উপস্থিতি অনুভব করা সম্ভব।


••• ২. “সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!” — পঙ্‌ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী?


প্রসঙ্গ : উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি এখানে ঈশ্বরের সর্বজনীন উপস্থিতি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছেন।


অন্তর্নিহিত অর্থ : কবির মতে, ঈশ্বর কোনো বিশেষ ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তিনি কেবল সাধু বা পণ্ডিতের নন; সকল মানুষের মধ্যেই তাঁর প্রকাশ রয়েছে। তাই মানুষে মানুষে ধর্ম, বর্ণ ও জাতির ভিত্তিতে ভেদাভেদ করা অর্থহীন। সকল মানুষকে সমান মর্যাদা ও ভালোবাসা দেওয়ার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরের প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করা সম্ভব। এই পঙ্‌ক্তিতে কবির মানবতাবাদী ও সাম্যবাদী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে।


••• ৩. “হায় ঋষি দরবেশ”—কবি কাকে ‘ঋষি দরবেশ’ বলেছেন এবং কেন?


প্রসঙ্গ : উদ্ধৃত কথাটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতা থেকে গৃহীত। ঈশ্বরের সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানো মানুষকে উদ্দেশ করে কবি এই সম্বোধন করেছেন।


ব্যাখ্যা : কবি সেই ঈশ্বরসন্ধানী ব্যক্তিকেই ‘ঋষি দরবেশ’ বলেছেন, যিনি জগদীশকে খুঁজতে আকাশ-পাতাল, বন-জঙ্গল ও পাহাড়-চূড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ‘ঋষি’ শব্দটি হিন্দু সাধকের এবং ‘দরবেশ’ শব্দটি মুসলিম সাধকের পরিচয় বহন করে। দুটি শব্দ একসঙ্গে ব্যবহার করে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে ঈশ্বরসন্ধান কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের একার বিষয় নয়; সকল ধর্মের মানুষের মধ্যেই এই অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।


••• ৪. “তাহারা খোদার খোদ্ ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!”—এই উক্তিতে কবির কী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?


প্রসঙ্গ : উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। শাস্ত্রবিদদের সম্পর্কে কবি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে এই মন্তব্য করেছেন।


ব্যাখ্যা : এই উক্তিতে কবির তীব্র ব্যঙ্গ, যুক্তিবাদী মনোভাব এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে। কিছু শাস্ত্রবিদ নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কারণে যেন ঈশ্বরের একমাত্র প্রতিনিধি বলে মনে করেন। কবি ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ কথাটির মাধ্যমে এই অহংকারকে বিদ্রূপ করেছেন। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঈশ্বরের ওপর একচেটিয়া অধিকার নেই এবং শুধু শাস্ত্রজ্ঞান থাকলেই ঈশ্বরের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।


••• ৫. ‘ঈশ্বর’ কবিতায় ‘সত্য-সিন্ধু’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? সেখানে ডুব দেওয়ার প্রয়োজন কেন?


প্রসঙ্গ : ‘সত্য-সিন্ধু’ কথাটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে। কবি শাস্ত্রের বাহ্যিক জ্ঞানের পরিবর্তে গভীর সত্য উপলব্ধির কথা বলতে এই রূপকটি ব্যবহার করেছেন।


ব্যাখ্যা : ‘সত্য-সিন্ধু’ বলতে গভীর, অসীম ও চরম সত্যের ভাণ্ডারকে বোঝানো হয়েছে। সেখানে ‘ডুব দেওয়া’ অর্থ আত্মঅনুসন্ধান, মানবিকতার চর্চা এবং সত্যকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করা। শুধু শাস্ত্রের পাতা ঘেঁটে বা ধর্মীয় তথ্য মুখস্থ করে ঈশ্বরের প্রকৃত পরিচয় জানা যায় না। তাই কবি মানুষকে বাহ্যিক পাণ্ডিত্যের সীমা অতিক্রম করে সত্যের গভীরে প্রবেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন।


---------------------------------------------------------------


D. কম-বেশি ২০০ শব্দে উত্তর দাও (যে-কোনো একটি): [FM 7]


••• ১. ‘ঈশ্বর’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঈশ্বর সন্ধানের স্বরূপ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা লেখ।


কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতায় ঈশ্বরসন্ধানের এক গভীর মানবতাবাদী ও আত্মজ্ঞানমূলক রূপ প্রকাশ পেয়েছে। কবির মতে, ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য আকাশ-পাতাল, বন-জঙ্গল, পাহাড়-চূড়া কিংবা দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই। কবিতার শুরুতেই তিনি সেই ঈশ্বরসন্ধানী মানুষকে প্রশ্ন করেছেন, যে জগদীশকে খুঁজতে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবির বক্তব্য, মানুষ নিজের অন্তরে থাকা অমূল্য সত্যকে সঙ্গে নিয়েই বাইরে ঈশ্বরের সন্ধান করে। তাই তিনি বলেছেন—“বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।”


কবি আরও বলেছেন, সমগ্র সৃষ্টি মানুষের সামনে উপস্থিত থাকলেও মানুষ যেন চোখ বন্ধ করে স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়ায়। “স্রষ্টারে খোঁজো—আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!”—এই পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে ঈশ্বরসন্ধানের সঙ্গে আত্মসন্ধানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ নিজের অস্তিত্ব, বিবেক ও অন্তরের মধ্যেই স্রষ্টার সৃষ্টির পরিচয় লাভ করতে পারে। তাই কবি ‘ইচ্ছা-অন্ধ’ মানুষকে চোখ খুলে নিজের মধ্যে স্রষ্টার ছায়া দেখতে বলেছেন।


কবির মতে, ঈশ্বর কোনো বিশেষ ধর্ম, সম্প্রদায় বা ব্যক্তির সম্পত্তি নন। তিনি “সকলের মাঝে” প্রকাশিত। তাই কোনো শাস্ত্রবিদ বা ধর্মীয় পণ্ডিতকে ঈশ্বরের একমাত্র প্রতিনিধি মনে করার প্রয়োজন নেই। ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ কথাটির মাধ্যমে কবি এই ধরনের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে ব্যঙ্গ করেছেন।


কবিতার শেষাংশে ‘রত্ন’ ও ‘রত্নাকর’-এর রূপকের সাহায্যে কবি দেখিয়েছেন যে শুধু শাস্ত্রের জ্ঞান থাকলেই ঈশ্বরের গভীর সত্য উপলব্ধি করা যায় না। প্রকৃত ঈশ্বরসন্ধানের জন্য আত্মঅনুসন্ধান, মানবপ্রেম ও সত্যের গভীরে প্রবেশ করা প্রয়োজন। তাই কবি আহ্বান জানিয়েছেন—“শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।” এইভাবেই কবি ঈশ্বরসন্ধানকে বাহ্যিক অনুসন্ধান থেকে আত্মোপলব্ধি ও মানবিক সত্যের উপলব্ধিতে উন্নীত করেছেন।


---


••• ২. ‘ঈশ্বর’ কবিতায় নজরুলের মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দাও।


কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতায় তাঁর গভীর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কবির কাছে ঈশ্বর কোনো বিশেষ ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় বা ব্যক্তির একার সম্পত্তি নন। তিনি সর্বজনীন এবং সকল মানুষের মধ্যেই তাঁর প্রকাশ রয়েছে। এই ভাবনা কবির বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিতে স্পষ্ট হয়েছে—“সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!” এই বক্তব্যের মাধ্যমে নজরুল মানুষের মধ্যে ধর্ম, জাতি ও বর্ণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ভেদাভেদকে অস্বীকার করেছেন।


কবিতার শুরুতে কবি ‘ঋষি’ ও ‘দরবেশ’—দুটি ভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতির শব্দ একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ‘ঋষি’ হিন্দু সাধক এবং ‘দরবেশ’ মুসলিম সাধকের পরিচয় বহন করে। এই দুই শব্দের সম্মিলিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কবির অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কাছে ঈশ্বরসন্ধান কোনো একটি বিশেষ ধর্মের মানুষের বিষয় নয়; সকল মানুষই সত্য ও স্রষ্টার সন্ধানী।


নজরুল ধর্মীয় পণ্ডিতদের অন্ধ অনুসরণকেও সমর্থন করেননি। “তাহারা খোদার খোদ্ ‘প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!”—এই ব্যঙ্গাত্মক উক্তির মাধ্যমে তিনি তাঁদের বিরোধিতা করেছেন, যারা নিজেদের ঈশ্বরের একমাত্র প্রতিনিধি বলে মনে করে। কবির মতে, ঈশ্বরকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তিতে পরিণত করা যায় না।


আবার ‘রত্ন’ ও ‘রত্নাকর’-এর রূপকের মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন যে শুধু ধর্মীয় জ্ঞান বা শাস্ত্রপাণ্ডিত্যই প্রকৃত সত্যোপলব্ধির পরিচয় নয়। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, আত্মজ্ঞান এবং সত্যের গভীর উপলব্ধিই প্রকৃত ধর্মচেতনার পথ।


অতএব, ‘ঈশ্বর’ কবিতায় নজরুল মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। সকল মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করার শিক্ষা দিয়েছেন। এই সর্বজনীন মানবপ্রেম, সাম্যবোধ এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধিতাই তাঁর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকৃত পরিচয়।


---------------------------------------------------------------


E. কম-বেশি ১৫০ শব্দে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [FM 5]


••• ১. ‘ঈশ্বর’ কবিতায় কবি কীভাবে বাহ্যিক ঈশ্বরসন্ধানের অসারতা দেখিয়েছেন?


কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য বাইরে আকাশ-পাতাল, বন-জঙ্গল বা পাহাড়-চূড়ায় ঘুরে বেড়ানো অর্থহীন। কবিতার শুরুতেই তিনি ঈশ্বরসন্ধানী মানুষকে প্রশ্ন করেছেন, যে জগদীশকে খুঁজতে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবির মতে, মানুষ নিজের অন্তরের অমূল্য সত্যকে সঙ্গে নিয়েই বাইরে ঈশ্বরের সন্ধান করে। তাই তিনি বলেছেন—“বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।”


মানুষের সামনে সমগ্র সৃষ্টি উপস্থিত থাকলেও সে যেন চোখ বন্ধ করে স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়ায়। “স্রষ্টারে খোঁজো—আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!”—এই পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে কবি আত্মসন্ধানের গুরুত্ব প্রকাশ করেছেন। নিজের অস্তিত্ব ও অন্তরের মধ্যেই স্রষ্টার ছায়া উপলব্ধি করা সম্ভব।


কবি আরও বলেছেন, ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নন; তিনি সকল মানুষের মধ্যেই প্রকাশিত। অতএব বাহ্যিক ভ্রমণ বা আচার নয়, আত্মজ্ঞান, মানবপ্রেম ও সত্যোপলব্ধিই প্রকৃত ঈশ্বরসন্ধানের পথ।


---


••• ২. ‘ঈশ্বর’ কবিতায় ‘রত্ন’ ও ‘রত্নাকর’ রূপকের তাৎপর্য আলোচনা করো।


কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈশ্বর’ কবিতার শেষাংশে ‘রত্ন’ ও ‘রত্নাকর’ রূপকের মাধ্যমে বাহ্যিক ধর্মজ্ঞান ও প্রকৃত সত্যোপলব্ধির পার্থক্য বোঝানো হয়েছে। রত্নের ব্যবসায়ীরা রত্ন চিনতে পারে এবং তা নিয়ে বেচা-কেনা করে, কিন্তু তাই বলে তারা রত্নের উৎস বা গভীর রত্নভাণ্ডার সম্পর্কে সব জানে না। কবি এই উদাহরণের সাহায্যে শাস্ত্রবিদদের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন।


কবিতায় ‘রত্ন’ বলতে শাস্ত্রের তথ্য, ধর্মীয় জ্ঞান ও বাহ্যিক পাণ্ডিত্যকে বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে ‘রত্নাকর’ গভীর, অসীম ও ঈশ্বরীয় সত্যের প্রতীক। কেউ ধর্মগ্রন্থের অনেক কথা জানলেই যে সে ঈশ্বরের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করেছে, তা নয়।


“রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে”—এই কথায় কবি শাস্ত্রজ্ঞানের অহংকারকে ব্যঙ্গ করেছেন। তাই তিনি মানুষকে শুধু বাহ্যিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না থেকে ‘সত্য-সিন্ধু’র গভীরে প্রবেশ করে আত্মঅনুসন্ধান ও সত্যোপলব্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।


------


'Ishwar' (God) || Kazi Nazrul Islam || Discussion || Questions and Answers || Class IX || Sahitya Sambhar || Bengali (Second Language) || WBBSE